কীভাবে আপনার আর্থিক পরিকল্পনা করবেন এবং আর্থিক পরিকল্পনার গুরুপ্ত, সুবিধা ও সাধারণ ভুল সমূহ

     অক্টো 30, 2023 / GMT+6

সাধারণভাবে একজন মানুষের বর্তমান ও সম্ভাব্য আয়ের উপর ভিত্তি করে সম্ভাব্য ব্যয় এবং সম্ভাব্য সঞ্চয়ের আগাম হিসাব প্রস্তুতিকেই আর্থিক পরিকল্পনা বলা হয়। বিশেষ ব্যয় বলতে আমরা পরিস্থিতির কারণে উদ্ভূত আকষ্মিক ব্যয়কে বুঝি। যেমন: হঠাৎ অসুস্থতা, দুর্ঘটনা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ইত্যাদি।

এখন আমরা আলোচনা করবো আর্থিক পরিকল্পনা কেন প্রয়োজন?


আয় বুঝে ব্যয় করাই মূলত আর্থিক পরিকল্পনার উদ্দেশ্য। আপনার আর্থিক সুস্থতা আপনার জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ। এটি আপনার আর্থিক ভবিষ্যতকে সংজ্ঞায়িত করবে। আর্থিক পরিকল্পনায় বর্তমান আয় এবং সম্ভাব্য আয়ের উৎসসমূহ চিহ্নিত করা হয়। একই সাথে, ভবিষ্যতে ব্যয় কী হতে পারে, কোন কোন খাতে এ ব্যয় হতে পারে তা চিহ্নিত করা হয়। একই সাথে সঞ্চয়ের বিষয়েও লক্ষ্য রাখা হয়।

ভবিষ্যতে হঠাৎ অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হলে তা কিভাবে মেটানো হবে, সে বিষয়ের একটা রূপরেখা থাকে। আবার আর্থিক ক্ষেত্রে অনেক সময়েই দিশাহারা দশা হয়ে যায় যখন বিনিয়োগের কোনও স্থির লক্ষ্য থাকে না, আয় সীমিত হয় অথচ আর্থিক পরিকল্পনা থাকে অনেক। এই পরিস্থিতিতে হাতে দুটি বিকল্প থাকে। প্রথমত, খরচ কমানো। দ্বিতীয়ত, বেশি আয় করা। কিন্তু খরচ কমানো সহজ কাজ নয়। প্রত্যেকরই বেশ কিছু দায়-দায়িত্ব থাকে। সেগুলি পালন করতেই হয়। তাই এই বিকল্পটাকে বাদ দিয়ে অন্য বিকল্পটি হল বেশি আয় যোগানো। কিন্তু হঠাৎ আয় বাড়ানো মুখের কথা নয়। তাই নিরাপদ ভবিষ্যত এবং আকস্মিক চাহিদা মেটানোর তাগিদে প্রত্যেকের আর্থিক পরিকল্পনা সম্পর্কে ধারণা থাকা প্রয়োজন। 


আর্থিক ডায়েরি কী?

সাধারণত প্রতিদিনের আয় ব্যয়ের হিসাব যে খাতা বা ডায়েরিতে লিখে রাখা হয়, সেটাকেই আমরা আর্থিক ডায়েরি বুঝি। এছাড়া, কম্পিউটার বা মোবাইলের মাধ্যমেও ভাচুর্য়াল আর্থিক ডায়েরি পরিচালনা করা যায়। 


আর্থিক ডায়েরি রাখার প্রয়োজনীয়তা কী?


আর্থিক ডায়েরি আর্থিক পরিকল্পনা করতে সহায়তা করে। প্রতি মাসে কত টাকা প্রয়োজনে বা অপ্রয়োজনে ব্যয় হচ্ছে সে সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে খাত ভেদে খরচ এড়ানো বা কমানোর মাধ্যমে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করে ভবিষ্যত আর্থিক প্রয়োজন পূরণে সক্ষমতা অর্জন করা যায়।


এখন আমরা আলোচনা করবো একটি স্মার্ট ফাইন্যান্সিয়াল প্ল্যান তৈরি করা যায়। 


একটি ভাল আর্থিক পরিকল্পনা আপনাকে আপনার জীবনের সমস্ত ভাল এবং খারাপ সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে সবসময় আপনাকে সাহায্য করতে পারে।


প্রথমে আপনার বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতি খুঁজে বের করুন। 


আপনার লক্ষ্যে পৌঁছানোর আগে আপনার বর্তমান আর্থিক অবস্থা এবং নেট মূল্য সম্পর্কে ভালভাবে সচেতন হওয়া উচিত। আপনার সম্পদ থেকে আপনার ব্যয় বিয়োগ করুন । আপনার সম্পদ বা অর্থ আপনার ব্যয় থেকে বড় হলে, আপনার একটি "ইতিবাচক" নেট মূল্য আছে। আর  আপনার ব্যয় আপনার সম্পদের চেয়ে বড় হলে, আপনার একটি "নেতিবাচক" নেট মূল্য আছে।


আপনি কীভাবে ব্যয় করছেন তার ট্র্যাক রাখতে আপনি প্রতি দিন বা প্রতি মাসে আপনার "নিট মূল্যের বিবৃতি" আপডেট করে রাখতে পারে। 


সময় ফ্রেম এবং বাজেট অনুযায়ী লক্ষ্য নির্ধারণ করুন। 


আপনার জীবনে স্পষ্ট লক্ষ্য থাকতে হবে। যেকোন প্রয়াসে সাফল্য অর্জনের জন্য পরিকল্পনা হলো সর্বোত্তম পথ এবং অর্থ পরিচালনার ক্ষেত্রেও এটি সমান ভাবে প্রযোজ্য | আর্থিক পরিকল্পনা হলো সেই রাস্তা যা আপনাকে আপনার নির্ধারিত লক্ষ্যগুলির দিকে নিয়ে যায়। আপনার লক্ষ্য স্বল্প-মেয়াদী, মধ্য-মেয়াদী বা দীর্ঘমেয়াদী হতে পারে। 


স্বল্পমেয়াদী লক্ষ্যগুলি হল সেই লক্ষ্যগুলি যা আপনি অদূর ভবিষ্যতের জন্য সেট করেছেন। এই লক্ষ্যগুলির নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং একটি উদ্দেশ্য রয়েছে যা আপনি এক বছর বা দুই বছরের সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে চান। অনেক স্বল্পমেয়াদী আর্থিক লক্ষ্য রয়েছে যা আপনার ইচ্ছার তালিকা অনুযায়ী সেট করা যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, পারিবারিক ছুটির জন্য সঞ্চয় করুন, উচ্চ প্রযুক্তির গ্যাজেট কিনুন ইত্যাদি।


মধ্য-মেয়াদী লক্ষ্যগুলি হল সেই লক্ষ্যগুলি যা আপনি আগামী তিন থেকে চার বছরে অর্জন করতে চান। এতে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যগুলি অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে যেমন বিবাহ বা উচ্চ শিক্ষার জন্য সঞ্চয় করা, একটি অভিনব গাড়ি কেনা, পূর্ববর্তী ঋণ পরিশোধ করা, বা ব্যবসা শুরু করা ইত্যাদি 

আপনার মধ্য-মেয়াদী লক্ষ্যগুলি কল্পনা করা শুরু করুন এবং আপনি কীভাবে সেগুলি অর্জন করতে পারেন তার পরিকল্পনা করুন এবং সেভাবে আপনার বাজেট সঞ্চয় করুন।


আর দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যগুলি হল সেইগুলি যা অর্জন করতে যথেষ্ট বেশি সময় নিতে পারে। আপনার সন্তানদের ভবিষ্যত, তাদের শিক্ষা, আপনার নিজের অবসর ইত্যাদির মতো দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যগুলির জন্য পরিকল্পনা করতে খুব সূক্ষ্ম পরিকল্পনা করা লাগে। আপনি স্বল্প-মেয়াদী এবং মধ্য-মেয়াদী লক্ষ্যগুলি সেট আপ করে শুরু করতে পারেন, সেগুলি সময়মতো সরবরাহ করতে পারেন এবং তারপরে আপনার দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যগুলি অর্জনের জন্য সেভাবে সঞ্চয় করা শুরু করতে পারেন।


এবার আমরা আলোচনা করবো ৫০–৩০–২০ পদ্ধতিতে কীভাবে আপনার আর্থিক পরিকল্পনা করবেন। 


৫০–৩০–২০ পদ্ধতি ব্যবহার করে আপনি আপনার আর্থিক কর্মকাণ্ডকে তিনটি ভাগে ভাগ করবেন। এগুলো হলো চাহিদা, সঞ্চয় ও আকাঙ্ক্ষা। আপনার আয়ের ৫০ শতাংশ আপনি খরচ করবেন জীবন ধারণের জন্য যেসব চাহিদা রয়েছে, তার পেছনে। এসব চাহিদার মধ্যে থাকে আপনার ঘরবাড়ির জন্য ব্যয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য ইত্যাদি। আয়ের ৩০ শতাংশ আপনি খরচ করবেন আপনার আকাঙ্ক্ষার পেছনে। যেমন বাইরে বেড়ানো, মাঝেমধ্যে রেস্তোরাঁয় খাওয়া কিংবা ভ্রমণের মতো কর্মকাণ্ডের পেছনে। আর ২০ শতাংশ আয় আপনি খরচ করবেন বিনিয়োগের পেছনে।


শতাংশের এই হিসাব অবশ্য আপনি আপনার বয়স, পরিস্থিতি, সামাজিক অবস্থান ইত্যাদির ওপর ভিত্তি করে একটু অদলবদল করতে পারেন।


উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আপনার আয় যদি ৬০ হাজার টাকা হয়, তাহলে ৩০ হাজার টাকা আপনি বরাদ্দ করতে পারেন চাহিদার পেছনে। বাকি অর্থের মধ্যে ১৮ হাজার টাকা আকাঙ্ক্ষার পেছনে এবং ১২ হাজার টাকা আপনি বরাদ্দ রাখতে পারেন সঞ্চয় ও বিনিয়োগের জন্য।


তবে আপনি যদি দেখেন এক খাতে বেশি বরাদ্দ রাখতে হচ্ছে, তাহলে অন্য খাতের সঙ্গে সমন্বয় করুন। মূল্য লক্ষ্য হলো যতটা সম্ভব ৫০–৩০–২০ পদ্ধতি অনুসরণ করা।


আর্থিক পরিকল্পনা তৈরি করার আমরা যেসব সাধারণ ভুল করি 


অনেক সময় লোকেরা এমন লক্ষ্য নির্ধারণ করে যা অর্জন করা খুবই অবাস্তব।একটি আর্থিক পরিকল্পনা কার্যকর করা ধৈর্যের কাজ। মানুষ মাঝে মাঝে ধৈর্য হারায় এবং সহজাতভাবে কিছু সিদ্ধান্ত নেয়। সেই সিদ্ধান্তগুলি সেই সময়ে সঠিক মনে হতে পারে তবে ভবিষ্যতে এটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে ইত্যাদি। 


আর্থিক পরিকল্পনার সুবিধাগুলি কী কী?


মূলত, এটি আপনাকে আপনার আয়, ব্যয় এবং বিনিয়োগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে যাতে আপনি আপনার অর্থ পরিচালনা করতে এবং আপনার লক্ষ্য অর্জন করতে পারেন। একটি আর্থিক পরিকল্পনা থাকার ফলে আপনি আপনার ব্যয়ের ট্র্যাক রাখতে পারবেন এবং খরচ কমাতে পারবেন এবং যখন এই সমস্ত জিনিসগুলি ঠিক থাকবে, আপনি দীর্ঘমেয়াদে আরও বেশি অর্থ সঞ্চয় করবেন।


ব্যক্তিগত আর্থিক পরিকল্পনা আপনাকে একটি অপ্রত্যাশিত ঘটনার দ্বারা আটকা পড়া থেকে রক্ষা করতে পারে যদি আপনার কাছে এটি মোকাবেলা করার পরিকল্পনা না থাকে। জরুরী তহবিল বা সঞ্চয় আপনাকে সময়মত এ ধরনের অপ্রত্যাশিত ঘটনা থেকে বাঁচতে সহায়তা করতে পারে। 


একটি স্মার্ট আর্থিক পরিকল্পনার মাধ্যমে, আপনি আপনার মাসিক বিল বা খরচ গুলি কভার করতে পারেন, আপনার ভবিষ্যতের উদ্দেশ্যগুলির জন্য ও বিনিয়োগ করতে পারেন ৷ ব্যক্তিগত আর্থিক পরিকল্পনা আপনাকে আপনার অর্থ কার্যকরভাবে জীবন পরিচালনা করতে দেয় যা আপনাকে মানসিক শান্তি প্রদান করে।


একটি স্মার্ট আর্থিক পরিকল্পনা থাকলে আপনাকে আপনার জীবনধারার সাথে আপস করতে হবে না এবং স্বাচ্ছন্দ্যে বসবাস করে আপনার লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব।


আর্থিক পরিকল্পনা সঠিকভাবে আপনার অর্থের সর্বোচ্চ বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক লক্ষ্য অর্জনে আপনাকে সহায়তা করে, যেমন আপনার সন্তানদের কলেজে পাঠানো, একটি বড় বাড়ি কেনা, একটি উত্তরাধিকার রেখে যাওয়া, বা আরামে অবসর নেওয়া ইত্যাদি।


তাই আমাদের সংকটে পড়ার অপেক্ষা না করে বা এরকম অপ্রত্যাশিত ঘটনা থেকে বাঁচতে আগে থেকেই একটি আর্থিক পরিকল্পনা তৈরি করা এবং সে অনুযায়ী কাজ করা উচিত। 

Join with us

পাঠান

Subscribe Now

Keep updated with the latest news!